সিলেট বিএনপিতে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও আরিফুল হক চৌধুরীর বলয় রয়েছে। দুই বলয়ে নির্বাচনের আগে থেকে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব ছিল। সিটি করপোরেশনের সাবেক দুইবারের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট-১ আসনে দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। একই আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশি ছিলেন খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর।
শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তে সিলেট-১ আসন থেকে নির্বাচন করেন খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর আর সিলেট-৪ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আরিফুল হক চৌধুরী এমপি হয়েছেন। দুজনেই মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন।
মন্ত্রিত্বের দায়িত্বে আসার পর দুজনের মধ্যে কোনো বিভেদ বা বলয় প্রকাশ্যে আসেনি। তবে, স্নায়ু যুদ্ধ ছিল, যা রাজনীতি সচেতন সবারই জানান।
সরকার গঠনের পর সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কয়েকটি পদে স্থান পেয়েছেন সিলেট বিএনপির নেতারা। তারা সবাই মুক্তাদির বলয়ের। যদিও সিলেটের প্রশাসনিক পর্যায়ে আরিফের প্রভাব কিছুটা বেশি ছিল। বলা হয়ে থাকে, সিলেটের সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম ছিলেন আরিফুল হকের বাই চয়েস। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে আরিফের প্রাধান্যও ছিল অনেকটা বেশি।
সম্প্রতি মাজার ইস্যুতে ডিসি সারওয়ার আলমকে সরিয়ে দেওয়া ছিল আরিফের গুরুত্বপূর্ণ ভরসায় পেরেক মারার মতো। তখন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদেশ সফরে ছিলেন মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
দেশে ফিরে তিনি বিমানবন্দরে গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, সারওয়ার আলম আমাদের চোখ খুলে দিয়েছেন। অবশ্য, ডিসিকে প্রত্যাহার বিষয়টি নিয়মিত বদলি বলে কিছুটা হালকা করে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
তাঁর সিলেট সফরের দুইদিনের মাথায় শুক্রবার সিলেটে আসেন মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর। সকালে সার্কিট হাউসে মাজার নিয়ে ডাকা সভায় ১২ সদস্যের কমিটিও করেন, যার প্রধান হিসেবে আছেন তিনি নিজেই। তবে, সেই কমিটিতে রাখা হয়নি আরিফুল হক চৌধুরীকে।
কমিটিতে যারা জায়গা পেয়েছেন তাদের বেশিরভাগই স্থানীয় রাজনীতিতে মুক্তাদিরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে জনশ্রুতি রয়েছে। অবশ্য বিএনপির রাজনীতির বাহিরে তাদের পরিচয় রয়েছে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার, জেলা পরিষদের প্রশাসক, মাজারের মোতোয়াল্লি পরিবারের দুজন সদস্য, মাজার মাদরাসা ও মসজিদের দুজন প্রতিনিধি। কমিটির সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সিলেটের জেলা প্রশাসক।
১২ সদস্যের কমিটির অন্যতম সদস্য আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি ও রেজাউল হাসান কয়েস লোদী সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দুজনেই খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের ঘনিষ্টজন হিসেবে সিলেটে জনশ্রুতি রয়েছে।
এদিকে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী এবং সিলেট সিটি করপোরেশনের দুইবারের নির্বাচিত সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর নাম কমিটিতে না থাকায় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা চলছে। বিশেষ করে কমিটি ঘোষণার দিন আরিফুল হক চৌধুরী নিজেও এলাকায় ছিলেন।
তাছাড়াও মাত্র দুই দিন আগে আরিফুল হক চৌধুরী নিজেই সাংবাদিকদের বলেছিলেন, মাজারের বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়েছে এবং সিলেটের সব সংসদ সদস্য, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের নেতা ও সুশীল সমাজকে নিয়ে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বৈঠকে গঠিত কমিটিতে তাঁর নাম না থাকায় আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
কমিটিতে আরিফুল হক চৌধুরীকে না রাখার কারণ জানতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও তিনি সাঁড়া দেননি। একইভাবে কমিটিতে না থাকার প্রতিক্রিয়া জানতে আরিফুল হক চৌধুরীর মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনিও সাঁড়া দেননি।
এদিকে কমিটি ঘোষণার বিষয়ে স্থানীয় বিএনপির কেউ মুখ খুলছেন না। এ বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহসাংগঠনিক মিফতা সিদ্দিকীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি অসুস্থতার কথা বলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই এ নিয়ে লেখালেখি করছেন। আরিফুল হক চৌধুরীকে কমিটিতে না রাখার সমালোচনা করে সাংবাদিক মাসুদ আহমদ রনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, মাজার কোনো সংসদীয় আসনের বিষয় নয়; এটি পুরো সিলেটের ঐতিহ্য। তাই সিলেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রতিনিধিকে বাইরে রাখায় প্রতিনিধিত্ব ও অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
সিলেট মহানগর বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাজারের দানের অর্থের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের উদ্যোগকে অধিকাংশ মানুষ ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে এমন একটি কমিটিতে সিলেটের মন্ত্রী ও দুইবারের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে না রাখায় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর মতে, আরিফুল হক চৌধুরীকে সদস্য না করলেও অন্তত পরামর্শক বা আমন্ত্রিত সদস্য হিসেবে যুক্ত করা হলে প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠত না।
উল্লেখ্য, গত ১২ জুন তৎকালীন ডিসি সারওয়ার আলম হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার পরিদর্শনে যান এবং আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ঘোষণা দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮ জুন মাজারে নতুন চারটি দানবাক্স স্থাপন এবং ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেগ ও একটি দানবাক্স সিলগালা করা হয়। এই ঘটনায় আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই রোববার (২১ জুন) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করা হয়।
প্রত্যাহারের প্রজ্ঞাপন জারির পরদিন সোমবার (২২ জুন) বেলা দুইটায় বিদায়ী ডিসির নির্দেশনায় দানবাক্স ও সিলগালা করা ডেগগুলো খোলা হয়। পরে ৭০০ বছরের প্রথা ভেঙে দানের টাকা প্রকাশ্যে গণনা করা হয়। গণনা শেষে জেলা প্রশাসন জানায়-চারদিনে আটটি ডেগ ও দানবাক্সে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা, ৭ আনা স্বর্ণালংকার ও ১০ সৌদি রিয়াল পাওয়া গেছে।
ডেস্ক নিউজ: 









