1. zahirul@bdnews24.eu : বিডি নিউজ24.ইউ ডেস্ক: : বিডি নিউজ24.ইউ ডেস্ক:
জীবন হতে নেওয়া গল্পঃ "করোনার মৃত্যু জ্বর হতে" - বিডি নিউজ ইউরোপ
Online TV
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০, ০৬:৩৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম
পা‌কিস্তা‌নের টি‌ভি‌তে ই‌ন্ডিয়ার পতাকা:‌ ‌বিব্রত ইমরান খান গ্রিসে আবারও হু হু করে বাড়ছে করোনা রোগীর সংখ্যা: ভাগ্য খুলতে পারে অনিয়মিত অভিবাসীদের ইতালিতে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়ালো ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সহজেই ইউরোপে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করুন গ্রীস থেকে পুশব্যাকের মাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে আতঙ্কে অভিবাসীরা সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক টি এম ফখরুল এর ঈদ শুভেচ্ছা দেশবাসীকে ঈদুল আযহার শুভেচ্ছা জানিয়েছেন -শেখ গোলাপ মিয়া ব্যারিষ্টার হলেন তারেক কন্যা জাইমা রহমান এথেন্সে বাংলা বুটিক হাউজের উদ্বোধন করলেন রাষ্ট্রদূত জসিম উদ্দিন নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের মহান বিজয় দিবস উদযাপন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে ৮ বছরের কারাদণ্ড কক্সবাজার সরকারি বিদ্যালয় দুটোর ভর্তি যুদ্ধ ফ্রেন্ডস অব চিলড্রেন কর্তৃক আয়োজিত এথেন্সের খ্রীষ্টমাস বাজারে বাংলাদেশ দূতাবাস ড. মুহাম্মদ ইউনুস কে নিয়ে আসিফ নজরুল এর স্ট্যাটাস বার্সেলোনায় পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা:)উপলক্ষে আলোচনা সভা ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত ওসমানী নগর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য শাহ জামাল আহমদ কে সংবর্ধনা প্রদান কক্সবাজারের রুহুল আমিন সিকদার গুরুতর অসুস্থ- দোয়া কামনা পরিবারের পুলিশের বাধায় পন্ড হলো ছাতকের ইসলামী সাংস্কৃতিক সন্ধা স্পেন আওয়ামীলীগের নবগঠিত কমিটির সভাপতি এস আর আই রবিন এবং সাধারন সম্পাদক রিজভী আলম ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার মোতাহের হোসেনের স্ত্রী ইন্তেকাল গ্রীসে যুবদলের ৪১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন দক্ষিণ ছাতক উপজেলা বাস্তবায়নে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ্বাস সিরিয়া পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্রের বাধা জুলুম থেকে বাঁচার দোয়া বাবার উদ্দেশ্যে ছেলে… সামাজিক ব্যবসা নিয়ে জার্মান পার্লামেন্টের স্পিকার ও ড. ইউনূসের মধ্যে বৈঠক বেশি লম্বা হওয়ায় মিলছে না হোটেল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল: শক্তিশালী হয়ে ধেয়ে আসছে বাংলাদেশের দিকে রাসেল হাওলাদারের দেশে বিনিয়োগে কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যন্য উদাহরণ জাতীয় তামাকমুক্ত সপ্তাহে রাজশাহীতে মতবিনিময় সভা চাঁদপুর জেলায় পদক্ষেপ বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন পদক্ষেপ বাংলাদেশের বিশ বছরে পদার্পণ ইতালি চলতি বৎসর ৩০,৮৫০ জন বিদেশী শ্রমিক নিবে যেখানেই অন্যায় সেখানেই দ্রুত প্রতিরোধ করতে হবে এ্যাড.মশিউর রহমান ঝালকাঠিতে স্বপন কুমার মূখার্জিকে সংবর্ধনা প্রদান ঝালকাঠি সুগন্ধা ও বিষখালী নদীতে ইলিশ ধরা বন্ধ, অভিযান শুরু অপহরণের একমাস পর কলেজ ছাত্রীকে গাজিপুর থেকে উদ্ধার দ্রুত ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার আহ্বানঃ লায়লা শাহ্

জীবন হতে নেওয়া গল্পঃ “করোনার মৃত্যু জ্বর হতে”

  • Update Time : সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২০
  • ৪০০ Time View

জীবন হতে নেওয়া গল্প :”করোনার মৃত্যুজ্বর হতে ”


(পর্ব -১)

মাহফুজুল আলম মাহফুজ ; ফ্লোরিডা, (যুক্তরাষ্ট্র) থেকেঃ

১.
নগর পুড়লে দেবালয় এড়ায় না, রুগী মরলে ডাক্তার বাঁচবেন এর নিশ্চয়তা নেই; এটাই করোনা। ২০২০ সালে কোভিড – ১৯ পুরো বিশ্বকে তার উত্তাপে পুড়িয়ে যাচ্ছে। যার তাপ রুমমেট বেলালের গায়েও শুরু হয়েছে। তাকে সেবা করতে গিয়েই বাবাহারা ও মায়ের একমাত্র প্রবাসী ছেলে আজ করোনায় আক্রান্ত। বেলালকে বাঁচাতে হবে কিন্তু নিজেকে মরতে হবে জেনেও একই রুমে বসবাস করতে হচ্ছে তার। কারণ সেও ব্যাচলর প্রবাসী। এড়িয়ে যাবার কোন উপায় নেই। কোথায় গিয়ে উঠবে সে। এখন সারা কাতার জুড়েই “লকডাউন”।

যা হবার তাই হলো। ভয়টা এবার সত্যি হলো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই ভাইটি হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়ে কাতরাচ্ছেন। আমি সাহস দিচ্ছি প্রতিদিন। বলছি, “কিচ্ছু হবে না”।

প্রথম দিনেই বললাম, “আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় মোটামুটি কাজ করে ভাই। দেখবেন, আল্লাহ চায় তো আপনি অবশ্যই সেরে উঠছেন।”
এভাবে প্রতিদিন ভরসা দিয়ে যাচ্ছি। ম্যাসেজে কথা চলছে বেশির ভাগ সময়। কারণ গলার ব্যাথা কিংবা নিশ্বাস নিয়ে প্রচন্ড কষ্টে থাকা এই ভাইটিকে কথা বলা হতে বিরত রাখতে চাই।

প্রচুর কেঁদেছে জানি। ডাক্তারের রিপোর্ট হাতে পেয়ে শুভকে জানিয়ে সে কি কান্না। যার বর্ননা শুভর কাছ হতে জানলাম। বললাম আমার সাথে কথা বলতে বলো। শুভ বললো, “ভাইয়া, এইমাত্র রিপোর্ট পজেটিভ এসেছে। পেয়েই আমাকে জানালো। প্রচুর কাঁদছে। আপনার সাথে কথা বলতে পারবে না। পরে কথা হবে।” আমি সাথে সাথে ধমক দিলাম শুভকে।
বললাম, “এখন ওর যেটা চাই তা হচ্ছে সাহস। আর এই সাহসটা তোর কাছে কতটুকু পাচ্ছে আমি জানি না। তবে আমি যেটা দেবো, তাতে সে নিজেই লজিক খুঁজে পাবে – নিজেকে বাঁচিয়ে তুলবার।”
তার পরপরই ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এলো এবং কথা হচ্ছিল স্ববিস্তারে।

পরের দিনই তাকে পুরোপুরি মোটিভেট করে ফেললাম। হাসপাতাল তাকে দিচ্ছে শারীরিক চিকিৎসা আর আমি দিতে শুরু করেছি মানসিক জোর। বললাম, “উপরে আল্লাহ আছেন।ডাক্তাররাও আছেন আপনার পাশেই। এবার আপনাকে সুস্থ হয়ে উঠতে হবে আপনার পরিবারের জন্য। বাবাহারা একমাত্র ছেলে হয়ে নিজের মায়ের জন্য, একমাত্র বোনের জন্য। লেখালেখির যেহেতু অভ্যাস আছে অতএব আপনি লিখুন, যা মনে আসে সব ; সবই লিখুন। আমি সব তুলে ধরবো।”

চিকিৎসার পাশাপাশি মনে হতে যা চায় লিখে ফেলতে বললাম। ছেলেটি ফেসবুকে প্রচুর লিখতে পারে। কান্নারত অবস্থায় আমাকে বলেছিল, “ভাইয়া, মরার আগে আপনাকে এবং শুভকে সব বলে যাবো। যাতে আপনারা আমার জীবন কাহিনী সবার কাছে তুলে ধরতে পারেন।”

২.
প্রচুর কান্না করে করে একদমই ভেঙ্গে পড়েছিলেন এ ক’দিনে। আমি দিন রাত যখন তখন খোঁজ নিয়ে যাচ্ছি। আমি পুরোপুরি তার মনটাকে অন্যদিকে সরিয়ে নিতে চাইলাম, যাতে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে।

ওর হাসপালে ক’দিন পার হলো সেটা জিজ্ঞাসা করা হয়নি। হঠাৎ ম্যাসেজ এলো মোবাইলে। খুলে পড়তে শুরু করেছি …

“ইনশাআল্লাহ, কোভিড-১৯ এর অস্থায়ী হাসপাতালে আজ আমার ৫ম দিন শেষ হলো। সুস্থ বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে কাজের ফাঁকে হাসি-খেলার ছলেই কেটে যাচ্ছিল আমার দিনগুলো। কিন্তু হটাৎ করেই হয়ে যাই বর্তমান অসুস্থ বিশ্বের কোভিড-১৯ নামক মহামারীতে আক্রান্তদের একজন।

অন্যান্য সময়ের মতই কাজ শেষ করে আমি বাসায় ফিরি প্রতিদিন। ফেইসবুক আর টিভি নিউজে শুধু প্রতিনিয়ত একটাই বিষয় “মহামারীতে লাশের ছড়াছড়ি”। পাশাপাশি প্রথম ধাপেই ইউরোপের সব থেকে ভয়ংকর রুপ নেওয়া দেশ – “ইতালি”। যেখানে স্বপরিবারে বসবাস করছে আমার সবচেয়ে প্রিয় ভবিষ্যৎ। ৬ বছর ধরে যার সাথে আমার মন দেওয়া নেওয়া চলছে। সম্পর্কের সন্মানের নামটি, “সুমি”।

বেলা শেষে সুমির সাথে কথা বলি। স্বান্তনা দিতে গিয়ে মাঝে মাঝেই ভাষা হারিয়ে ফেলি। আমার অবস্থানরত কাতারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও আস্তে-ধীরে তা অবনতির পথেই ছুটতে থাকে। আক্রান্তের সংখ্যাও বেড়ে গেছে। তাছাড়া যে ৪ জন মারা গেছেন এখানে, তারা সবাই বাঙ্গালী। সুতরাং ভেতরে যেন ভয়টা আরও বেড়ে গেলো।”

৩.
এ পর্যন্ত পড়ে আমি দম নিলাম। ভেবে খুবই ভালো লাগছে যে একজন কোভিড -১৯ এর রোগীকে দিয়ে ভিন্ন কিছু করাচ্ছি। যিনি আমার কথায় কলম তুলে নিয়েছেন হাতে। তারমানে আমি তাকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছি যে তিনি আমাদের মাঝে অবশ্যই ফিরে আসছেন। মনের অজান্তে চোখের কোনে ভেজা কিছুর আঁচ পাই। ঢোক গিললাম সেই মনের অজান্তেই। ঝাপসা চশমার ফ্রেম মুছলাম একবার। তারপর আবার পড়া শুরু করলাম।

“প্রতিদিন আমি কাজ চালিয়ে যাচ্ছি কিন্তু ভেতরে একটা অজানা ভয় আমায় শেষ করে দিচ্ছে। হঠাৎ রুমমেট বেলালের জ্বর, সর্দি, কাশি, গলা ব্যাথা। বেলালকে আমি সেবা দিচ্ছি বটে কিন্তু ভয়ে আমি চারদিক অন্ধকার দেখছি। ডাক্তারের সুচিকিৎসা আর আমার সেবা দু’য়ে মিলে আমার রুমমেট অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠছে।

এভাবেই আমি প্রতিনিয়ত কাজ করতে থাকি। কাজের অবসরে দেশে আমার পারিবার ও ইতালিতে আমার বাকদত্তার সাথে কথা হয়। কিন্তু না, বেলাল সুস্থ হবার ২-৩ দিন পরেই আমিও অসুস্থতা অনুভব করি।

৪.
আজ এপ্রিলের ২ তারিখ। কাজ শেষে বাসায় এসে আমার অসুস্থতা অনেক বেড়ে যায়। ৩ তারিখ ভোর ০৬ঃ২৭ মিনিটে এ্যাম্বুলেন্স এসে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তখন আমি পুরোপুরি অসুস্থ নই। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার সামনে কি হতে যাচ্ছে? আমি হাসপাতালে আসার পরক্ষণে আমার সামনেই ভাইরাসে আক্রান্ত কাতারের ৪র্থ বাঙালী ব্যাক্তিরও মৃত্যু হয়। এখন আমার মনে হলো আমার সিরিয়াল পাঁচ হবে ঐ মৃতের লিস্টে। মানষিক ভাবে আরও ভেঙ্গে পড়লাম।

তেশরা এপ্রিল আমি প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ বিভাগে ভর্তি হই। প্রথম থেকেই ডাক্তার আমাকে সান্ত্বনা দিতে থাকেন ; যদিও আমার অসুস্থতা আরও বাড়তেই থাকল। এই অসুস্থতার মাঝেও আমার ফ্যামিলির সর্বত্রই যোগাযোগ হচ্ছিল। কখনই আমি বুঝতে দেইনি যে আমি অসুস্থ। ফোন দিয়েই বলতাম, “ঘুম থেকে উঠেই ফোন দিয়েছি তো, তাই ভয়েস কিছুটা ভারি ভারি লাগছে।”

৫.
জীবন হতে নেওয়া গল্পের এ পর্যন্ত এসে আমি একটু পেছনে ফিরে যাই। প্রবাসের দশ-দশটি বছরের মাঝে আমিও কত কি পার করেছি। প্রবাসীরা মিথ্যুক হয়। কথাটি এই হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়ে প্রমাণ হলো আরও একবার। নিজের মায়ের কাছে, নিজের একমাত্র বোনের কাছে ; মিথ্যে বলে যাচ্ছে হরদম। কারণ মায়ের ঘুম হারাম হয়ে যাবে সত্যিটা জানলে। আঁছড়ে পড়বে চিৎকার – একমাত্র ছোট্ট আদরের ভাইয়ের জন্য কোন এক বোনের কলিজায়।

মনে মনে বললাম, ভাইরে দেশে থাকতে সামরিক ট্রেনিং এর সময় আমার ডান পা ভেঙ্গে গিয়েছিল। ছয় মাস পর আমার বাড়ির লোকেরা জেনেছিলেন। কারণ আমার মেঝমামা ক্যান্সারে হঠাৎ একদিন মারা যান। পরিচিত আমার এক কলিগকে খুব করে ধরেছিলেন আমার মা। বলেছিলেন, “মাহফুজ যেন তাড়াতাড়ি বাড়ি আসে।”
আমি তখন চট্রগ্রামে। সব কিছু বুঝে আমার কলিগটি সব সত্যি না বলে পারলেন না।

বললেন, “ওর তো পা ভেঙ্গেছে। প্লাস্টার করা পায়ে হাসপাতালের বেডে ২১ দিন ছিল। এখন ট্রেনিং ব্যারাকে। তাও প্রায় চার পাঁচ মাস হলো। আমার মনে হয় না ও আসতে পারবে।”
সেদিনের আমার মিথ্যেটি ছিল আমার মা যেন আমার চিন্তায় তাঁর ঘুম, খাওয়া, নাওয়া সব বাদ দিয়ে না দেন। মায়েদের কিছু বলতে হয় না। তাঁরা একটুতেই চিন্তার কপালে ভাঁজ ফেলেন, চোখের তরলে ঢেউ তোলেন, আঁছড়ে পড়েন জায়নামাজের পাটিতে।

কিন্তু কাতারের এই প্রবাসী ভাইটি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং ক’দিন পরেই পুরো পৃথিবী হতে চলে যেতে পারেন। তবুও নিজের মা-বোনকে কিছুই জানিয়ে যেতে চান না। এ যে কত বড় সিদ্ধান্ত, কতখানি ভালোবাসা বুকে ধরলে এসব ভাবা যায়, কত বড় পাষাণ মন হলে এটা করা যায়; আমি তা ভাবতেই পারিনি। তাই ২৭ বছরের টগবগে যুবকের লেখায় আবারও মনযোগ দিলাম।

৬.
“অন্যান্য হাসপাতালের মতো স্বাভাবিক পরিবেশ এখানে নেই। অনেক আক্রান্ত রোগী রয়েছে কিন্তু কারো সাথে কারো কোন কথা নেই, পরস্পরের সহযোগীতা নেই। পরিবেশটা গা শিউরে উঠার মতো। রাতে আমার অসুস্থতা আরও বাড়তেই থাকে। এদিকে ইমার্জেন্সি ডাক্তার সেই রাতেই নিজেও করোনায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন। কপাল যে আমার বেগতিকের দিকে নিয়ে যাচ্ছে তা আর বুঝতে বাকি রইল না।

চার তারিখ সকালের প্রথম প্রহরে আমার সমস্ত পরীক্ষা শেষ। যার রেজাল্ট আর ২৪ ঘন্টা পরে হাতে পাবো। অপেক্ষার প্রহর যে বড়ই কষ্টের। সারাদিন সুমি আমাকে ফোন দিয়েছে কিন্তু আমি তার ফোন পিক করিনি। কেননা ফোনটি রিসিভ করলেই আমাকে অভিনয় করতে হবে। বুকের মধ্যে চাপ অনুভব করছি। এই সুন্দর পৃথিবী হতে জেনে শুনে নিরবে নিভৃতে চলে যাচ্ছি কিন্তু কাউকে বলতেও পারছি না সেই সত্যিটি। এই জন্যই খুব বেশি বেশি কষ্ট হচ্ছে।

একটি অসুস্থ মানুষ কতটা সময় সুস্থতার অভিনয় করতে পারে? তারপরও আমাকে করতেই হবে। ভালবাসার মানুষেরা যেন কোন ক্রমেই জানতে না পারে আমি আসলে কতটা অসুস্থ।

৭.
এরপর সন্ধায় আমার মায়ের ফোন। রিসিভ করেই ঘুমের অভিনয় করলাম। বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল হাউমাউ করে চিল্লাই। মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে বুক ভাসাই। নাহ্, সেটাও পারতে নে যে।
এবার বোনের প্রশ্ন, “কাতারে তোমার কোন কাজ নেই সারাদিন, শুধু ঘুমাও নাকি?”

আমি বলতে পারলাম না ; আমি সারা জীবনের ঘুম দেবার জন্য তৈরী হচ্ছি আপু। যে ঘুম হতে তুই আর কোন দিনও এই ছোট্ট ভাইটিকে তুলতে পারবি না। তোর ঠোঁটের ছোট্ট চুমু আমার কপাল ছোঁবে না, আপু। তোর ভাগের আঁচার কেড়ে খাবার লোক পাবি না দেখবি। তোর আঁচার পড়েই থাকবে বেহুতোষ বাতাসে। সেদিন কেউ ছোঁবে না, দেখিস। কারণ আমি যে থাকবো নারে, আপু।”

এবার আমার চোখের জল গড়ালো। করোনার নিজের হাতে লেখা নয়, এই লেখা। এ লেখা প্রবাসী করোনার রোগীর আঙ্গুলের ছোঁয়ায় লেখা কোন পাজড়ভাঙ্গা আর্তনাদ। আমার মোবাইলের স্ক্রিনে আঙ্গুল ছুঁইছুঁই করে। পরের লেখাগুলো পড়বো বলে আমার আঙুলের ঢগা দিয়ে মোবাইল স্ক্রিনটি স্ক্রল করি। লেখা উপরে উঠে যায় কিন্তু আমার পড়া হয় না সেসব। দিনের আলোয় ঝাপসা লাগে মোবাইলের স্ক্রিন।

৮.
এবার সময় নিলাম। নিজেকে সরিয়ে নিতে চাই আবেগের স্থান হতে। আমার মতই এই প্রবাসী ভাই, এক সময় সামরিক বাহিনীতে চাকুরী করতেন। অতএব তাকে হেরে যাওয়া সৈনিকদের কাতার হতে সরিয়ে নিয়ে আসতেই হবে।

ভিটামিন সি, ভিটামিন ডি থ্রি, জিংক, গরম পানীয় খাওয়া, গরম পানি দিয়ে গোসল করা সহ সব কিছু সাধ্যের ফরমেশ করেছি। আমার মনে হলো এই ভাইটি আমাকে বিশ্বাস করেছেন এবং আরও করতে চাইছেন। ভাগ্যের কপালে আশ্বাসের প্রসারণ দেখেই বললাম, “পরের লেখাটি যেভাবে বলেছি ঠিক সেভাবেই লিখে পাঠাও, যাতে তোমার অভিজ্ঞতা দেশের মানুষের কোন উপকারে আসে। আমি ভার্চুয়াল ও মিডিয়া জগতে তা ছড়িয়ে দিতে চাই।”
তারপর পরের দিন, আবারও লেখা পেলাম।

“আমিও গত ১ সপ্তাহের অভিনয়ে পাকা অভিনেতা হয়ে গেছি। বোনকে বলে দিলাম, “বাইরে লকডাউন তাই রুমে শুয়ে শুয়ে শুধু ঘুমাই।” বলেই ফোনটা রেখে দিলাম। এমতাবস্থায় অভিনয় করাটাও আমার জন্য দ্বায় হয়ে গিয়েছে।

পরিবারের সাথে অভিনয় শেষ না হতেই আবারও সুমির ফোন। আর কত অভিনয় করা যায়? আমি তো মরেই যাচ্ছি, তা নয় তো কি? অবশেষে তাকে কিঞ্চিৎ আভাস দিলাম যে আমি কিছুটা অসুস্থ। ভালবাসার মানুষের সাথে কিছু ভালো কথাও বাষ্পায়িত ধুম্রজালে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উঠে যায় ইতালির কোন শহরের আকাশে। আজ তারেখটি চার হলেও কাতারের কোন হাসপাতালের বেডে শুয়ে মনে হলো পাঁচ তারিখটি যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দিনটি হয়।”

৯.
পাঁচ তারিখটা গলা ব্যথার কোনই পরিবর্তন হলো না। তাপমাত্রা কিছুটা কমে এলো বিকেলে। কিন্তু নিশ্বাস নিতে প্রচন্ড কষ্টে কাটলো সেদিনটি। আমি নিয়মিত খোঁজ খবর রাখছি। আমার বাসার সবাই বিষয়টি জানেন। তারা দোয়া করছেন তার জন্য।

সারা কাতারের বিভিন্ন হাসপাতালে মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে যখন আমি তখন কোন করোনা রোগীর হাত দিয়ে লেখিয়ে নিচ্ছি করোনার কষ্টের জ্বালা। মনটাকে ঘুরিয়ে দিতে চাইছি সাহসের পাল্লায়। এছাড়া আমি আমেরিকার ফ্লোরিডায় বসে আরেক প্রবাসীর জন্য আর কিবা করতে পারি?

এইমাত্র ম্যাসেজ এলো। বুঝলাম সারা পৃথিবীতে এত বাতাস থাকতে কেন সে এত কাতরাচ্ছে কিছুটা নিশ্বাস নিয়ে বাঁচার জন্য। পড়তে শুরু করলাম,

“আজ ৬ই এপ্রিল। আজ অতি চিন্তা ও মৃত্যু ভয়ে রাতে ঘুমের পরিমাণ খুবই কম হলো। এদিকে আমার শারীরিক অবস্থা আরও বেগতিক। সকালে প্রতিদিনের ন্যায় ডাক্তার প্রাত্যহিক সবকিছুই পরিক্ষা করছেন। জ্বরটা খুবই বেড়েছে। জ্বর প্রায় ১০৪° এর কাছাকাছি। সর্দি, কাশি, গলাব্যাথা, শ্বাসকষ্ট সহ সব কিছুই যেন আমার মনোবল আর আত্নবিশ্বাসকে এখানেই থামিয়ে দিতে চাইছে।

তখন আমার সাধ্য না থাকা সত্যেও আমার সৃষ্টিকর্তাকে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করেছিলো, “হে খোদা, তোমার এই সুন্দর ধরনী ছেড়ে আমি যেতে চাই না। তোমার এই অপরুপ সৌন্দর্যমন্ডিত পৃথিবীতে আর কয়েকটি দিন আমি বেঁচে থাকতে চাই। আমি আমার মায়ের বুকে ফিরে যেতে চাই, আমি আমার ভালবাসার স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই। হে খোদা, আপনি আমাকে শেষ বারের মতো একটি সুযোগ দিন।”

১০.
আমি শিউরে শিউরে উঠছি। মনোযোগ দিলাম বাকিটুকু পড়তে।

“হাজারো অসুস্থতার মাঝে চিন্তা হতে লাগলো মৃত্যু আমার অতি সন্নিকটে। সুতরাং আমার পরিবার, ভালবাসার মানুষ, বন্ধু-বান্ধবের জন্য কিছু ভালবাসা জানিয়ে রেখে দিতে চাই। তাই অশ্রু শিক্ত চোখে এক টুকরো কাগজ আর কলম নিয়ে বসলাম। চেষ্টা চালালাম দু’লাইন লিখতে। কিন্তু হাজারো চেষ্টা করেও তা পারলাম না। কেননা মৃত্যু ভয়ে আমার শরীর কেবল কাঁপাচ্ছিল। তারপর চোখের পানিতে কাগজটিও নষ্ট হয়ে গেল। অবশেষে দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় আমি লিখলাম …

প্রিয় সুমি,
এবার না হয় তুমি থাকতে শিখো একা,
না ও তো আর হতে পারে তোমার সাথে দেখা
না ও তো আর ভুলতে পারো অতীতের কথা,
ক্ষমায় দেখো প্রবাস পারে চাপিয়ে রাখা ব্যথা।”

নীচে ছোট্ট করে লেখা “রাকিবুল হাসান”। লেখাটি আরও অনেক বড় ছিল। কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট তার আবেগ বোঝানোর জন্য।

১১.
রকিবুল আবার লেখা শুরু করলো,
“সুমিকে আজ সব সত্যি বলতেই হবে। কেননা সুমিরও ভবিষ্যত বলতে একটা কথা আছে। আমি তার ভবিষ্যত ধ্বংস করে দিতে পারি না। বেলা শেষে ওর ফোন আসলো। অতি করুন কন্ঠে “আসসালামু আলাইকুম” শুনতেই তাকে কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলি। তারপরও আজকেই সব জানাতে হবে।
কেমন করে শুরু করবো? কিছুই বুঝতে পারছি না। হটাৎ আমিও পাগলের মতো আমার ফোনে থাকা কিছু রিপোর্ট এর ছবি সুমিকে পাঠালাম।

তার চোখে অজস্র পানি ঝরছে, যা বুঝতে বাকি রইল না। কান্নার শব্দের সাথে সাথে ফোনে ভেসে আসতে থাকলো, “ভুয়া ডাক্তার, এটা বানানো রিপোর্ট। এসব আমি বিশ্বাস করি না। আমি ডাক্তারের সাথে কথা বলতে চাই।” এসব বলে হাউ মাউ করে কাঁদতে শুরু করলো।

কোন ভাবেই সুমিকে বোঝাতে পারছি না। কি বোঝাবো তার ভাষাই তো জানা নেই। শুধু এটা জানি তাকে আজ আমার সত্যটা বলতেই হতো এবং আমি সেটাই করেছি। এখন আমি মুক্ত।
এই অন্তিম মুহুর্তে কি করতে হবে আমার জানা ছিলো না। আমি শুধু এটাই বোঝাতে চেষ্টা করছিলাম মাত্র “এসবই নিয়তি”।

অবশেষে সুমির সাথে জোর করেই কথা শেষ করলাম। এভাবেই বুকের মাঝে মুখরিত কান্নার শেষ আশ্বাসটুকু আর রইল না।”

হয়তো প্রবাসে মানুষগুলোর এই সময় মনে পড়ে মায়ের মুখ, মনে পড়ছে বোনের মুখ, মনে পড়ছে মৃত বাবার শেষ খাটিয়ার যাত্রা। গ্রামের বাড়ির ডাংগুলি, সাতচাড়া, চড়ুইভাতি, কুমির কুমির, গোল্লাছুট, মায়ের হাতের বোকুনি, বাবার আদর, বন্ধুদের আড্ডা, ক্লাস ফাঁকি এসবই আস্তে আস্তে মলিন হয়ে যাচ্ছে বৃত্তের আঁধারে। সাতরঙা সাজে সাজবে না কোন মায়ের পুত্রবধূ।

এখন শুধু আছে প্রবাসীদের মৃতযাত্রার শুরু। আছে নীল কন্ঠের কারুকার্যে কালো ভীতি। নেই জাপটে ঝড়িয়ে ধরা বেঁচে থাকার আকুতি ভরা কোন স্বজন মায়ের কোল। আছে মৃত্যুর শুরু কিন্তু শেষ কোথায় কেউ জানে না। শুনেছি কাতার সরকার গণ কবর দিচ্ছে। গোসল হয় না কারো, দেখেনা কোন প্রিয়জন, কাঁন্নার কোন শব্দ পৌঁছে না মৃতের কানে। অন্ধকার রাতের আঁধারে বস্তায় ভরা হয় গণকবরে নামাতে। মাটি চাপা দেওয়া হবে চেপে চেপে, যেন কোন করোনার মৃত্যুজ্বর হতে করুণ গোঙ্গানীর শব্দ কোনদিন কারো কাছে পৌঁছে না যায়।

আর আমি, একটুও ভাবতে চাইনা বলেই গল্পের বাকি অংশ আবার কাল লিখতে শুরু করবো।।

(চলবে ….)

লেখক পরিচিতি :
পেশায়: বৈমানিক এবং বিমান যন্ত্রপ্রকৌশলী ; কলামিস্ট, লেখক ও গল্পকার; সাবেক অনুষ্ঠান উপস্থাপক (বাংলাদেশ বেতারের)।

বিডিএনইউ/১৩ এপ্রিল ২০২০/জই/এথেন্স

এই নিউজটি ভালো লাগলে আপনার ফেইসবুক টাইমলাইনে সেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই সম্পর্কিত আরো খবর

Copyright © All rights reserved

Developed By BD-Europe IT Zone
Our%20family%20
         
Disclaimer  Advertisement Privacy  About us  Contact us